246

অবিচার শেষ কথা নয়

রওনক রেহানা

‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি – নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’

অকালপ্রয়াত কিশোর কবি সুকান্তর মতো ত্বকীর ভূমষ্ঠি হবার দিন এ অঙ্গীকার আমিও করেছিলাম। সুকান্তের মৃত্যু হয়েছে যক্ষ্মা রোগে আর ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে। হায়, আমি চলে যাইনি! কিন্তু ত্বকীর মতো চলে যেতে থাকা সন্তানদের জন্য কোনো সৎ, কার্যকরী প্রশাসনিক নিরাপত্তায় বা দুষ্টরে দমন আর শিষ্টরে পালন হয় এমন স্বদশে, জনপদের নাগরকিও আমি নই! এখানে প্রতিনিয়ত শিষ্টরে দমন আর দুষ্টরে পালনই চলছে। এখন পরর্বতী প্রজন্মের অবস্থা এমন হয়েছে যে, ‘বালক জানে না কতটা হেঁটে এলে ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।’ ঠিক এই কারণেই আমার ত্বকীর আর পথ হাঁটা হলো না। ত্বকী ‘ডেইলি স্টার’ পুরস্কার নিতে গিয়ে পরিচিতি প্রকাশে জীবনের লক্ষ্য জানাতে গিয়ে লিখেছিল, ‘সততাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে লালন করব।’ ত্বকী বেঁচে থাকতে একটা ছড়া প্রায়ই আবৃত্তি করতাম, ‘মন্দরা ছিল মন্দরা আছে থাকবেও চিরকাল, তবুও ভালোর ছোঁয়া লেগে শুভ হোক আগামীকাল।’

এখন আমার কণ্ঠ থেকে কোনো ছড়া, কবিতা বা গান বেরোতে চায় না, কণ্ঠ যেন রুদ্ধ হয়ে আসে। কিন্তু আমার চোখের জলে কোনো স্মৃতি মুছে যায়নি, ত্বকীর সাথের প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি মুর্হূত থেকে আমি ফিরে পেতে চাই বর্তমান ও ভবিষ্যতে ত্বকীর সাথে আমার জীবনযাপনের আকাক্সক্ষায়, অথচ যা আর কোনোদিন হবার নয়। কিন্তু ত্বকী যে ভালোর ছোঁয়ায় পৃথিবীকে শুভ করতে চেয়েছিল সেই ভালোর পথে হাঁটবে আমাদের আগামী।
আমি যখনই শক্তি চট্টোপাধ্যায়রে ‘মানুষ’ কবিতা থেকে আবৃত্তি করতাম ‘মানুষ বড় কাঁদছে তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও’- তখন প্রতিবারই আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার শিশুসন্তান আপন মনইে বলে চলত ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও তোমাকে দাঁড়াতেই হবে’। এইসব ছোট ছোট সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্নার জীবন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রক্ষার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের, সমাজের তথা বিবকেবান সকল মানুষের। বিবকেহীন নরপশুদের চিহ্নিত করে বর্জন করতে না পারলে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে মানুষ হয়ে বাঁচতে চাওয়া শহীদ ত্বকী, সাগর, রুনি, নূর হোসনেদের সংখ্যা শুধু বাড়তেই থাকবে।

তাই প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালকদের কাছে আবেদন বুকভরা লোভের ঐ স্বার্থ ঠুলি খুলে ফেলে স্বাধীন দেশে মানুষের স্বাধীন পথচলাকে নিশ্চিত করুন।

‘বুলেটের রক্তিম পঞ্চমে কে চরিবে ঘাতকের মথ্েিয আকাশ? কে গাইবে জয়গান?’- মানিক বন্দোপাধ্যায়ের এই আহ্বানে বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশের সুসন্তানেরা। কোনো অবিচারই শেষ কথা নয়, সব মানুষের ভেতরের অন্তর্যামী বিবেক আর চেতনার ঝড়ে আমাদের তরুণ প্রজন্ম বৃক্ষ বা নদী হবার মহৎ ব্রত ধারণ করে এই দেশকে শিশুর বাসযোগ্য করে তুলবে – এই বিশ্বাস আমাদের একদিন অবশ্যই সূর্যের মুখ দেখবে।