189

লালন সাঁই ও তাঁর গান

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী

ফকির লালন সাঁই বাউল ঐতিহ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম নাম। তিনি বিভিন্ন ঐতিহ্য ও উৎসের ভক্তিমূলক আচার-অনুষ্ঠানকে সমন্বিত করে নিজের স্বতন্ত্র, নিজস্ব ও একক একটি অবস্থান তৈরী করেছেন। বৌধ্য ধর্মের সহজিয়া, বৈষ্ণব তত্তে¡র সহজিয়া ও ইসলামের সূফিবাদের সমন্বয়ে এবং বিভিন্ন ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের মাধ্যমে শিল্পের প্রকরণগত সতন্ত্র-বৈশিষ্ট তৈরী করেছেন। তৈরী করেছেন সার্বজনীন ও চিরায়ত এক জিজ্ঞাসা। লালন সাঁইকে খাঁটি বৈষ্ণব অথবা শুদ্ধ সুফী কোনটিতেই ফেলা যাবে না। লালনের গান বহুবিস্তৃত মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। লালনের গানের কথা ও সুরে এক রহস্যময়তা ও অলৌকিক সান্নিধ্য বিদ্যমান। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর ১১৯ বছর পরেও তাঁর গানের মৌলিক ও নিখাদ রূপটির সংরক্ষণের কাজটি করা যায়নি। যদিও সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, এন.জি.ওগুলো ও বিভিন্ন ব্যক্তি স্বউদ্যোগে ১৯৬০ সাল থেকে লালনের উপর কাজ করে চলেছেন কিন্তু এর বেশির ভাগ কাজই প্রচার সর্বস্ব, লোকদেখানো। তারপরেও এ কাজের মধ্য দিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক যেমনি তৈরী হয়েছে, আবার লালনের দর্শন ও কর্ম নিয়ে বহু উচ্চমানের গবেষণা এবং আলোচনাও তৈরী হয়েছে।

লোক সংগীতের ক্ষেত্রে মৌলিক যে সমস্যাটি রয়েছে, কন্ঠ থেকে কন্ঠে প্রবাহমানতার ফলে এর আদি ও মৌলিকত্বের পরিবর্তন ঘটে চলে। ধ্বনি, জ্ঞান ও সুর কন্ঠ থেকে কন্ঠে স¤প্রচারিত হতে হতে এর পরিবর্তন অনিবার্য। লালনের গানের ক্ষেত্রেও এর ব্যাতিক্রম ঘটেনি। লালন সাঁই নিরক্ষর ছিলেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে ফকির মনিরুদ্দিন শাহ্ মাঝে মধ্যে তাঁর গানের কথাগুলো শুনে শুনে টুকে রাখতেন। কিন্তু মনিরুদ্দিন শাহ্ এর লেখা পান্ডুলিপিগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় এখন তার আর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্যদিকে বাউল ধর্মের অনুসারি যাঁরা, যাঁরা লালনের ধর্মীয় মতবাদ ও মানবতাবাদের অনুসারি তাদের কাছেও এর পান্ডুলিপি নেই। ফলে দশকের পর দশক কবিতার চরণগুলো বাউলদের মুখে-মুখে রূপান্তরিত হয়েছে। মূল থেকে গীতিকবিতাগুলোর পরিবর্তন ঘটেছে।

কোনকোন গবেষক লালনের গানের সংখ্যা দুই হাজার বলে উলে­খ করেছেন; আবার কোন কোন গবেষক ও বাউলদের মতে এর সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশী। লালনের মৃত্যুর বহু বছর পরে যে সমস্যাটি তৈরী হয়েছে তা হল লালনের গান যেমনি অন্যের নামে প্রচারিত হচ্ছে আবার কিছু অন্যদের গানও লালনের গান বলে দাবি করা হচ্ছে। গোপাল শাহ্, আদম চাঁনের কিছু গান লালনের নামে প্রচারিত হচ্ছে বলেও কথা রয়েছে। ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে’ গানটিকে কেউ কেউ শরৎ বাউলের গান বলে যেমনি উলে­খ করেন, আবার ‘বল কী সন্ধানে যাই সেখানে’ গানটিকে মুকুন্দ দাসের গান বলেও কেউ কেউ দাবি করতে চান। লালনের ‘তিন গর্ভে আছেরে এক ছেলে’ গানটি লালনের কিনা তা নিয়েও আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ এটি একটি খাঁটি বৈষ্ণব বাদের উপর ভিত্তি করে রচিত গান। মোদ্দাকথা এসব বিতর্ক নিয়েই লালন সাঁই আমাদের মাঝে বিদ্যমান।