208

জনান্তিকে ত্বকীর জবানবন্দি

ড. সফিউদ্দিন আহমদ

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শতপুত্রের মৃত্যুতে গান্ধারী প্রতিজ্ঞা করলেন যে, তিনি আর অন্নজল স্পর্শ করবেন না। এই উক্তি শুনে ভয়ানক ক্ষেপে গেলেন জমদগ্নি। সাথে সাথেই এই ক্ষুধার দেবতা গান্ধারীর পেটে বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধার সঞ্চার করলেন। ক্ষুধায় অস্থির হয়ে পড়লেন গান্ধারী কিন্তু এই যুদ্ধক্ষেত্রে খাবার পাবেন কোথায়! হঠাৎ দেখলেন সামান্য দূরে একটি কলাগাছে কলা প্রায় পেকে ওঠেছে। এই পুত্রশোক ও অশৌচ অবস্থায়ই তিনি কাঁচাপাকা কলা খেতে উদ্যত হলেন- কিন্তু কলা তিনি নাগাল পাচ্ছেন না! শেষপর্যন্ত শতপুত্রের স্ত‚পীকৃত লাশের উপর দাঁড়িয়েই একে একে সব কলা খেয়ে ফেললেন।

জমদগ্নি বললেন, ‘কী গান্ধারী, তুমি যে বড়ো প্রতিজ্ঞা করেছিলে শতপুত্রের মৃত্যুতে আর অন্নজল স্পর্শ করবেনা- এখনতো দেখছি শতপুত্রের বুকের উপর দাঁড়িয়েই কলা খেয়েছো।’

মহাভারতের সেই গান্ধারী আর আজকের পুত্রশোক-কাতর একজন প্রগতিশীল বাবা এক নয়। নয় বলেই সংসারের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা, আঘাত-প্রতিঘাত ও ঝড়-ঝঞ্ঝা সব কিছুকে উতরিয়ে এগিয়ে যাওয়া দুষমনের দুর্গ ভেঙ্গে চির উন্নত শিরে সামনে চলা এবং সংগ্রামে জয়ী হবার প্রত্যয়ে অটল থাকাইতো একজন প্রগতিশীল মানুষের আদর্শ। প্রগতির পতাকা সে উঁচিয়ে রাখবেই। কারণ একজন প্রগতিশীল মানুষ জানে মানুষ কখনো পরাজিত হয়না এবং মানুষ কখনো পেছনে যায়না। প্রগতির পতাকা হাতে সামনে এগিয়ে যাওয়াইতো প্রগতিশীল মানুষের অভিধা। তাই পথ যতোই বাঁকা ও আঁধার হোক না, সামনে যতোই মৃত্যু মাতাল অগ্নিসমুদ্র থাকনা কেনো- সামনে যেতেই হবে এবং নতুন পথ সৃষ্টি করতেই হবে।

একথাগুলো বলছি পশুপাখির ছোবলে নিহত ‘তানভীর ত্বকী’র বাবা রফিউর রাব্বি প্রসঙ্গে। অমিত প্রতিভার অধিকারী কিশোর ত্বকীকে হারিয়ে তিনি শোকাহত হয়েছেন, আঘাত পেয়েছেন। কিন্তু হতাশা বা আদর্শচ্যুত হননি। শোককে সংগ্রামের আগুনে প্রজ্জ্বলিত করেছেন।

ত্বকী হত্যার পর আমি নারায়ণগঞ্জে পাঁচটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানে আমার পাশেই ছিলেন ত্বকীর বাবা। তার সাথে আমার দীর্ঘদিনের আদর্শিক মেলবন্ধন। সাংগঠনিক কাজে তিনি আমার রায়পুরার বাড়িতে গিয়েছেন।

একজন আদর্শিক সাথী হিসেবে আমি তাকে যতোটুকু জেনেছি তিনি শুধু একজন সুসংস্কৃত, পরিমার্জিত নন্দিত মানুষ, সব সময়ই তার মুখে হাসি লেগেই থাকতো। তবে ত্বকী হত্যার পর যদিও আমার মনে হয়েছে প্রচÐ ঝড়ের তাÐবে লÐ-ভÐ এরক বিধ্বস্ত প্রান্তর। অথবা সুনামীতে ক্ষত-বিক্ষত এক বিবর্ণ ছবি। এরপরও তিনি বিভ্রান্ত বা আদর্শচুত্য হননি।

ত্বকী হত্যার পর পাঁচটি অনুষ্ঠানে তার সাথে দেখা এবং বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা হলেও তার কাছে আমি ‘ত্বকী প্রসঙ্গ’টি উত্থাপন করিনি। কারণ আমি জানি এই প্রসঙ্গটি তুললে তিনি একটু বিচলিত হবেন এবং ক্ষতাক্ত হৃদয়ে আবার রক্তের ক্ষরণ হবে। মর্মভেদি ব্যথা ও হাহাকারকে আবার উসকিয়ে দেয়া হবে। তাই ‘ত্বকী প্রসঙ্গ’টি আমি অতীব সচেতনভাবেই এগিয়ে গেছি।

আমি বার বারই মনে করেছি ‘ত্বকীদের’ বাসায় যাবো- তার মা-র সাথে কথা বলবো কিন্তু এ সাহস আমার হয়নি- বারবার পা আটকে গেছে। অনেকেই আমাকে বলেছেন ‘ত্বকীদের’ বাসায় নিয়ে যেতে কিন্তু আমার মন সায় দেয়নি। কারণ সেখানে গিয়ে আমাকে শুনতে হবে কিছু কান্না ও কিছু হাহাকার।

শেষবার নারায়ণগঞ্জের অনুষ্ঠানে ‘ত্বকী’র বাবা, আমি দেশের সংকট, আমাদের মানসিক ও আত্মিক অবক্ষয়, দেশ ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয় নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি- কিন্তু প্রসঙ্গটি নেপথ্যেই রয়ে গেছে। আলোচনার শেষ পর্যায়ে ‘ত্বকী’র বাবা আমাকে বললেন, ‘ত্বকীর ওপর একটা বই হবে- আপনার একটা লেখা চাই।’ আমার এ লেখা কোন তাত্তি¡ক বা গবেষণামূলক লেখা নয়- ত্বকী প্রসঙ্গে আমার অনুভ‚তি মাত্র।

একদিন মানুষের শত্রæ ছিলো সাপ, বাঘ, সিংহ, হিং¯্র জন্তু ও ভয়াল প্রকৃতি। আজ মানুষের সবচেয়ে বড়ো শত্রæ মানুষ।

এইমাত্র যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করেছে তার জন্য এক ফোঁটা দুধ বরাদ্দ নেই- কিন্তু তাকে হত্যা করার জন্য রয়েছে লক্ষ কোটি ডলার পাউন্ডের অস্ত্র। আজ মানুষের সবচেয়ে বড়ো প্রতিযোগিতা মানুষকে হত্যা করার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আবিষ্কার। যুদ্ধোন্মাদ রক্তপাগল এই নরঘাতক মানুষকে নিয়েই রবীন্দ্রনাথের উচ্চারণ-

১. যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু নিবাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ বেসেছ কি ভালো?

২. নাগিনীর চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস
শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস
বিদায় নেবার আগে তাই ডাক দিয়ে যাই
দানবের সাথে সংগ্রামের তরে
প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে।

ত্বকীকে নিয়ে কোন দার্শনিকতার প্রয়োজন নেই। তার কবিতার মাধ্যমেই জনান্তিকে সে যে জবানবন্দি দিয়ে গেছে- এই জবানবন্দিতেই পুরো ত্বকীকে খুঁজে পাওয়া যাবে এবং তার বাবার লেখাটিও তার জীবনের মূল আকর। প্রথমেই আমি বলবো যে, হয়তো পারিবারিক আবহ বিশেষ করে তার আদর্শিক বাবা ও মা-র চিন্তা-চেতনার অভিযোজনায়ই ছোটকাল থেকেই তার মনে জীবন, জগৎ, বৈশ্বিক বলয়, দেশ, মাটি ও মানুষ, বিশ্বপ্রকৃতি এবং শোষণ-পেষণ ও নির্যাতন সম্বন্ধে তার মনে একটা জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধিৎসার উৎসারণ ঘটেছিলো। আর এমনটি ছিলো বলেই এই মৃত্যুর মাত্র ক’দিন আগে তার কলম থেকে বের হলো-
আমি প্রস্তর হয়ে মরলাম উদ্ভিদ হতে
উদ্ভিদ হয়ে মরি, তো উত্থিত প্রাণে
মানুষ হয়ে উঠলাম পরে, যখন সত্য উদ্ভাসিত হল
ভয় কিসের? দ্বিধা কেন মৃত্যুতে?

একজন কিশোরের এই ভাবনা, এই চিন্তা বিশ্বেরস তাবৎ দর্শন, জীবন জগৎ ও বিবর্তন আবর্তনকে উতরিয়ে, সমস্ত দর্শনকে উজিয়ে আমাদের বিস্মিত ও স্তম্ভিত করে দেয়। মনে মনে ভাবি এ কী কোন অলৌকিক বাণী! এ দর্শনের পাঠ সে কোথঅয় পেলো? কেউ কী কল্পনা করতে পারেন যে এ দর্শন কোন এক কিশোরের!

কিশোর ত্বকী যে বয়সে নিহত হয়েছে এ সময়টা ছিলো কল্পনার, রঙিন কাঁচ দিয়ে রঙিন পৃথিবীকে দেখার। এ বয়সের পৃথিবীটা গানময়, প্রাণময়, আনন্দময়, প্রজাপতির রঙিন পাখায় ভর করা এবং আকাশে লক্ষ তারার দেয়ালি উৎসবে মেতে উঠা, ফুল নিয়ে পাখি নিয়ে মাতোয়ারা হওয়া। হয়তো বলবে-
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা
মনে মনে
মেলে দিলেম গানের সুরে এই ডানা
মনে মনে।

কিন্তু না, কিশোর ত্বকী কল্পনার রঙিন কাঁচ দিয়ে পৃথিবী দেখেনি। সে দেখেছে- খুন, সন্ত্রাস, হত্যা, শোষণ, নির্যাতন, অন্যায় ও অত্যাচার এবং দেখেছে-
১. জননী মাগিছে ভিক্ষা ঘরে ঢেকে রেখে ছেলের লাশ।
২. মেডিকেলের ফুটপাতে বিনা চিকিৎসায় মানুষ মরে।
৩. ড্রেনে ডাস্টবিনে মানুষ কুকুরে উচ্ছিষ্ট খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি।

সমাজের এই দৃশ্য ত্বকীকে চকিত করে। সে উঁকি দিয়ে তাকায় সময়ের ঘড়ির কাঁটার দিকে। মিথ্যে হয়ে যায় তার কাছে ‘মানুষ মানুষের জন্য’। মানুষের এই দানবীয় হুঙ্কার ও পৈশাচিক কান্ড দেখে এই কিশোর চিৎকার করে জানিয়ে দেয়-

ওরা ছুরি ও
ধারালো অস্ত্র দিয়ে
দ্বিখন্ডিত করে কণ্ঠনালী,
ওরা উল্লাসে দেখে
কিভাবে শরীর থেকে
বৃষ্টির মতো রক্ত গড়ায়-
ধারালো অস্ত্র দিয়ে
শরীরের চামড়া ছিলে নেয়,
এবং দেখে ভেতরের মাংসপেশী ও হাড়গোড়।
ওরা টুকরো টুকরো করে হাড়গোড়,
খন্ড বিখন্ড করে ফেলে
বীভৎস উল্লাসে।
ওরা সেই সব মৃত মানুষের মাংস খায়
বর্বর অন্ধকার যুগে যেমনি মানুষখেকোরা
ভক্ষণ করেছে তাদের স্বজাতিকে-

ওরা রাইফেলে ট্রিগার টিপে
প্রতিবাদের চিৎকারকে স্তব্ধ করে দিতে,
ওরা স্তব্ধ করে দিতে চায় জীবনের স্পন্দন,
পরিধানে
দেহের অস্থি ব্যবহার করে,
ধারালো অস্ত্র দিয়ে
হত্যা করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান,
ওরা মানুষের রক্ত ভালোবাসে
এবং মানুষের হৃদয়কে বিষিয়ে তোলে
বিকৃত করে
সমাজ আর নিষ্কলুষ মানুষেরে;
ওরা ভয় দেখাতে চায় আদিম হিং¯্রতায়!

কার্ল মার্কস শ্রেণি চরিত্রের কথা বলেছেন। ঘাতকশ্রেণির ঘাতকেরা চিরদিনই ঘাতক এবং তারা একই শ্রেণির। হিটলার, আল বদর, আল শাসম, রাজাকার এবং সকল নরখেকু নরঘাতক শ্রেণি চরিত্র হিসেবে তারা একই। এরা দেবোপম গোবিন্দদেব, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও ত্বকীকে একই পদ্ধতিতে হত্যা করে। এরা নির্মম, নিষ্ঠুর, এরা ক্ষুধার্ত কুকুর। এদের হাতে কারো রক্ষা নেই। ওরা জান্তব পশু। রক্তের খেলায়, রক্তের হলি-উৎসবে ওরা মেতে ওঠে। কিশোর কবি ত্বকী এ বিষয়টি ভালো করেই উপলব্ধি করেছিলো। তার রক্তকণিকার প্রবাহে, প্রাণের স্পন্দনে এ চেতনা চন্চন্ স্পন্দিত হয়ে ওঠেছে। তাই সমগ্র হৃদয় সত্তা উজার করে দিয়ে এই ঘাতকদের চরিত্র ও চিত্র অঙ্কন করেছে ত্বকী।

এক ঝাঁক কুকুর
একটা কুকুর
গর্জন করে ওঠে
এক ঝাঁক কুকুর
দৌড়ে এলো কাছে
দেখল একটা শিকার
ঝাঁপিয়ে পড়ল
তার কাঁধে
শেষ করে দিল

  • প্রাণ।

ত্বকীর কবিতা যতোই পড়ি ততোই আমি বিস্মিত হই তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য চেতনা এবং তীক্ষè ও তীব্র সমাজ সচেতনতা বোধ। মুগ্ধতায় ভরে দেয় আমাকে বাণী বিন্যাস, শব্দ প্রয়োগ ও বক্তব্যের ওজস্বিতায়। তার কবিতা পড়লে মনে হয় সে তার বয়সকে ছাড়িয়ে অনেকটাই সামনে এগিয়ে গেছে এবং পরিণত ফুল ও ফল দেবার সময় এসেছে।

এখানে একটি বিষয় আমাকে বলতে হচ্ছে যে, আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দির উত্তরণে এসেছি। কিন্তু আমাদের সন্তানদের, আমাদের শিক্ষার্থীদের কেনো জানি এখনো পুরোপুরিভাবে মৃত্তিকাস্পর্শী ও শিকড় সন্ধানী করে তুলতে পারিনি। কেনো জানি এখনো তাদের দেশ, সমাজ, মাটি ও মানুষ এবং জীবন জিজ্ঞাসা ও আত্মজিজ্ঞাসায়, উৎসের সন্ধানে, স্বরূপের সন্ধানে ও আত্মপরিচয়ে অনুসন্ধিৎসু করে তুলতে পারিনি।

গত দু’বছর আগে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ‘ঊপযড় ০৭ ঊধংঃ’ শিরোনামে একটি বক্তৃতা সমাপনের পর হিবার্ট স্মিথ আমাকে বলেছিল, মহান ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত বিজয়ে ভিয়েতনামের পর সমগ্র বিশ্বে তোমরা একটি গৌরবান্বিত ও গৌরবোজ্জ্বল জাতি। তোমরা পেছনে পড়ে থাকবে কেনো-? সাহিত্য, শিল্প ও বিজ্ঞান দর্শনে এবং সঠিক উন্নয়নেতো তোমাদের এগিয়ে যাবারই কথা।

এ ব্যর্থতা আমরা যারা শিক্ষক এবং কবি সাহিত্যিক শিল্পী ও বুদ্ধিজীবিদেরও। আমরাতো আমাদের মহিমান্বিত অতীত ও গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যকে এবং আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আমাদের শিক্ষার্থী তথা আমাদের প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারিনি। এবং এক ধরনের ঔপন্যাসিক আমাদের সন্তান ও শিক্ষার্থীদের তাদের কল্পকাহিনীতে আকাশে উড়িয়ে ও দূরয়েন বাসনার নৌকোয় ভাসিয়ে মৃত্তিকাবিচ্যুত ও শিকড়বিহীন করে নেশায় মাতোয়ারা করে তুলছে। এবং তারা শেষপর্যন্ত ট্যানেলে আশ্রয় নেয়- হিরোইন ও মাদকাসক্ত হয়ে যায়।

আমাকে বিস্মিত করে ত্বকীর দেশ, সমাজ, মানুষ ও স্বদেশ চিন্তা এবং মহান ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার ভাবনা। এ সাধারণ কথা নয় যে, মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দি পরও আজকের এই কিশোর মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নতুন করে ভাবছে।

ত্বকীর শিকড় মহিমান্বিত অতীত আর গৌরবোজ্জ্বল বাংলাদেশের হৃদয়ে প্রোথিত। ত্বকীর মন-মানস গভীরতায়- বলা যায় মুক্তিযুদ্ধ তার হৃদস্পন্দনে, আত্মার গভীরে, রক্তকণিকার প্রবাহে ও প্রাণের স্তরে স্তরে। আর এসব কিছুরই মূল আকর তার বাবা মা ও পারিবারিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক আবহ। আমি বিস্মিত হই কিশোর ত্বকী যখন বলে-
তাঁরা বেঁচে আছে
স্বাধীনতার ৪১ বছর পরেও
একটি নতুন যুগ,
একটি নতুন সময়,
যেখানে ঘৃণা অপমান নেই
সেই সব জীবন
যেখানে উন্মত্ত হবে না কেউ কাউকে
হত্যার জিঘাংসায়,
অমঙ্গল অকল্যাণ ঠাঁই নেবে না কারো চিন্তায়
সমতার সমাজ হবে,
সবারই আদর্শ হবে বাংলাদেশের সেইসব সন্তান
যাঁরা যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলো,
যাঁরা অপেক্ষায় আছে আজো একটি বিচারের-
একটি বিচার
যা শেষ করার জন্যে
তাঁরা
যুদ্ধের সেই সব নায়কেরা
ডাক দিয়ে যায়-
জাতির জন্যে, জেগে ওঠার জন্যে
ওই জাতির জন্যে; যারা ধ্বংসের মধ্যেও
নতুন জীবনের ডাক দিয়ে যায়;
তুমি কি শুনতে পাও
সেই সব শহীদদের কণ্ঠস্বর
যা প্রতিধ্বনি হচ্ছে বহুদিন ধরে?

ত্বকী প্রত্যয়ী, আশাবাদী। সে জানে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তের বদলে, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের রক্তের বদলে ক্ষুধাহীন, শ্রেণিহীন, শোষণহীন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে ওঠবে। সামনে ওই নতুন সূর্য উঠবে-। এই ত্বকীর আশাবাদ-
অবশ্যই বাংলাদেশ জেগে উঠবে
সামনের উজ্জ্বল দিন
মেঘ মুক্ত আকাশ
আমার রূপসী বাংলাদেশ
কোথায় আর সব
যাঁরা ধাবমান
যাঁরা পেছনেও নেতৃত্বে থাকে
যাঁরা ভয়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করে
তাঁরা অপেক্ষায় আছে,
তুমি ফিরে এসো,
ফিরে এসো সেখান থেকে
ফিরে এসো
আমার বাংলাদেশ।

ত্বতীর কবিতাগুলো ভালো করে পড়লেই উপলব্ধি করা যাবে যে, তার কবিতায় ভাস্বর হয়ে ওঠেছে একটি প্রতিবাদী চেতনা এবং সমাজ প্রগতি ও সমস্ত প্রতিবন্ধকতা থেকে মানুষের মুক্তি। কবিতাকে ত্বকী বিলাসী আর্টের চর্চা অথবা কলাকৈবল্যবাদীদের মতো ‘কেবলই স্বপন করেছি বপন পবনে’ এমন নয়। তার কবিতার অন্তরের উদ্ভাস বিশ্লেষণ করলেই আমরা দেখতে পাবো- সেখানে একটা দৈশিক ও সামাজিক উপযোগিতা আছে। যেমন-
১. সাহিত্য ও শিল্প মানুষের মুক্তি ও সমাজ প্রগতির জন্য।
২. মেহনত হতেই সমস্ত শিল্পকর্মের উৎস।
৩. সাহিত্য ও শিল্পকলা শুধু বিনোদন ও সৌন্দর্য সাধনের জন্য নয়- উদ্দেশ্য সাধনের জন্যও।
৪. সংস্কৃতি শুধু বিনোদন ও বিলাসের জন্য নয়- সমাজ ও সভ্যতার সুস্থ বিকাশের জন্য।

আমরা বলবো কল্পনা থেকে নয়- ত্বকীর কবিতায় যে তীব্র তীক্ষè সমাজ সচেতনতা তা আদর্শিক চেতনার আত্মস্থতা থেকে। কারণ বাবা-মা-র আদর্শের বুনন তার হৃদয়তন্ত্রিতে। কাজেই এ জমিনে প্রগতির ফসল, সাম্যের ফসল ও মানবমুক্তির ফসল ফলবেই। শ্রমে ঘামে সিক্ত মানুষের মিছিল ও প্রগতির পতাকা হাতে জনতার মিছিল সামনে যাবেই।

উপর্যুক্ত আলোচনার সমর্থন ত্বকীর কবিতায়ই পাওয়া যায়। আমি এখানে তার ‘সাম্য’ কবিতাটি উপস্থাপন করছি-
ঘরে ঘরে জ্বলে উঠবে
জ্ঞান-প্রীতির আলো
থাকবে না হিংসা বিদ্বেষ-
মানুষে সাম্য হবে
সকলেই এক হবে
সকলের জ্ঞান হবে
আকাশ চ‚ড়ায়। [সাম্য]

ঠিক একই উচ্চারণে উচ্চকিত ‘স্বপ্ন’ কবিতাটি। এখানে সে বলেছে মানুষের মতো মানুষ হতে হবে এবং সকলেরই সমান অধিকার চাই-
আমাদের স্বপ্ন
মানুষ হওয়া
দু’বেলা খাওয়াই তো
সব নয়।
আছে মানুষ হয়ে
চলার স্বাদ,
সমান অধিকার
জ্ঞানে পথ চলার। [স্বপ্ন]

আমাকে মুগ্ধতায় ভরে দেয় ত্বকীর কতিার বিষয়বস্তু, শিরোনাম, প্রতীক, উপমা, উদাহরণ ও উৎপ্রেক্ষা। আগেই আমি তার বাণীবিন্যাস ও চিত্রকল্পের বিষয়টি আলোচনা করেছি। তার কবিতা পড়লে কখনো বুঝা যায় না যে, এক কিশোরের লেখা। সে মিতবাক, প্রমিত ও সংযমিত। আর তার ধ্যানে ও জ্ঞানে, ভাব ও মনন-পরিমন্ডলে দ্রবীভ‚ত হয়ে আছে মানুষ, বাংলাদেশ ও স্বাদেশিক চেতনা-। এ প্রসঙ্গে এখানে তার ‘স্বদেশ’ কবিতাটি উপস্থাপন করছি-
ফুলের মতো দৃশ্যমান
রক্তমাখা রাজীবের চোখ
সবুজ পাতার সাথে
দৃশ্য জুড়ায় লাল-সবুজের পতাকা।
যেন বলে ওঠে
এই তো স্বদেশ
লাল সবুজের বাস যেখানে
প্রকৃতি ও সংগ্রামে।

ত্বকীর মধ্যে জেগে উঠেছিলো বিশ্বাত্মবোধ ও বৈশ্বিক চেতনা। মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদের দুর্গ- এ দুর্গ ভেঙ্গে মানুষকে একই কাতারে দাঁড়াতে হবে। ভুলে যেতে হবে এই ভেদাভেদ-বৈষম্য। নজরুল যেমন এক মোহনায় দাঁড়িয়ে এক মিলনের গান গাওয়ার কথা বলেছেন- তেমনি কিশোর ত্বকীও বলেছে-
সমগ্র মানবজাতি আজ এক কাতারে দাঁড়াবে-
হিংসা বিদ্বেষের উর্ধ্বে উঠে,
জলাঞ্জলি দিয়ে হিসেব কষা,
ছড়িয়ে দেবে ভালোবাসার গান-
বলবে মানুষ চাই সমানে সমান।

ত্বকীর ‘কারা সেই রাজহাঁস’ কবিতাটি আমাদের হৃদয়কেও ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত করে। মনে পড়ে তমসাতীরে নিষ্ঠুর ব্যাধ ক্রৌঞ্চ পাখির বুকে তীর নিক্ষেপ করেছিলো- পাখির বিদীর্ণ বক্ষ থেকে টপ্ টপ্ করে পড়েছিলো রক্তের ফেঁাঁটা। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে বাল্মীকির কণ্ঠ থেকে বের হয়ে আসে অলৌকিক কাব্যবাণী- তেমনি আমাদের সমাজে খুন, হত্যা, লাশের মিছিল দেখে ত্বকীর হৃদয়ও ক্ষতাক্ত ও রক্তাক্ত হয়ে ওঠেছে। এই কবিতাটি প্রতীকসর্বস্ব ও রূপ। আমি কবিতার কিছু অংশ এখানে উপস্থাপন করছি-
ওরা সমাজকে হত্যা করে
পেশীশক্তি দিয়ে,
টুকরো টুকরো করে
ধারালো অস্ত্র ও ছুরি দিয়ে-
ওরা চায় রক্ত
ওদের শার্টে কাপড়ে মেখে
মানুষকে দেখাবে বলে-
ওরা রক্ত দিয়ে রাঙিয়ে নেয় জামা,
রক্তাক্ত, কলঙ্কিত, কাদামাখা;
অথচ কাদা নয়
যন্ত্রণার রক্ত ঝরে ঝরে পড়ে
ওদের ওপরে-
কারা সেই রাজহাঁস?
ওরা কারা!

এই প্রতীক ও রূপকধর্মী আর একটি কবিতা ‘বাতিঘর’। কবিতাটি আমাদের সমানে চলার পথে নির্দেশনা এবং আশা, সম্ভাবনা ও উত্তরণের আলোয় উজ্জ্বল। কবিতাটি আমি এখানে উপস্থাপন করছি-
দীর্ঘ একটি বছরের শেষ,
নতুন বছর শুরু-
আভ্যন্তরীণ সৌজন্য, কৌশল
নিরুত্তাপ স্বাধীনতা;
তারকামন্ডিত।
এসো আমরা একসাথে চলি
প্রশান্তিতে,
ক্ষিপ্রতায় নয়, অথচ বায়ে,
কালের গৌরবের
সেই সব তরুণদের বাতিঘর হয়ে।

শাহবাগ ও গণজাগরণ মঞ্চ এক নবজাগরণের সৃষ্টি করেছিলো। এই জাগরণের সাথে চেতনায় ত্বকী একাত্ম হয়ে লিখেছে-
লুকোচুরি খেলবো বলে
চলে এলাম তোমার আগে
সংগ্রাম চলছে শাহবাগে-

শুধু কবিতায় নয়- শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে নিয়ে ত্বকী একটি প্রবন্ধও লিখেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, লাল-সবুজ পতাকা, বাংলার প্রকৃতি এবং রাজীব ও ত্বকী একাত্ম হয়ে গেছে সংগ্রামী ভ‚মিকায়।

ত্বকীর বাইরের অবয়বটা ছিলো শান্ত প্রকৃতির কিন্তু ভেতরে ছিলো বিসুভিয়সের উদগীরণ। তার বাবার জবানীতে-
‘বন্ধুবান্ধব হইহুল্লোড় খুব একটা পছন্দ করত না। বন্ধু তেমন একটা ছিলও না। বন্ধু বলতে হয়তো আমিই ছিলাম। কারণ ওর যা বলার, যতটুকু বলার প্রয়োজন বোধ করত, আমার সাথেই করত। কারও বিরুদ্ধে কখনো অভিযোগ ছিল না। বন্ধু, পরিজন, শিক্ষক কারও সম্পর্কে কখনো কোনো অভিযোগ করেনি। কেউ দুঃখ পাবে, এমন আচরণ ছিল ওর নীতি ও রীতিবিরুদ্ধ। দূরের বা অপছন্দের কেউ হলেও না। ছিল স্বল্প ও মৃদুভাষী। প্রকৌশলী হওয়ার ইচ্ছে ছিল। বলেছিলাম, এ-লেভেল শেষে দেশের বাইরে চলে যাও। পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এসো। ও দেশের বাইরে যেতে চাইত না। মাকে বলত, দেশে থেকে কি লেখাপড়া হবে না? দেশের পড়াশোনা কি এতই খারাপ যে বাইরে যেতেই হবে? আমি শুনে বললাম, বাইরে যাওয়াটা দোষের কিছু না। আমাদের সামনের যে মানুষগুলো রয়েছেন, তাঁরা সবাই তো বাইরে গিয়েছেন, বিশ্ব ঘুরেছেন। বাইরে না গেলে ভেতরটাকে ঠিক জানা যায় না। ভেতরটা ভালো করে জানার জন্য, বোঝার জন্য হলেও বাহিরটাকে জানার প্রয়োজন পড়ে। আমার সঙ্গে কিছুই বলল না। পরে মাকে বলল, তোমাদের ছেড়ে আমি কোথাও যাব না, থাকতে পারব না।’

ত্বকীর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বিস্মিত হই। দু’চোখ দিয়ে সে মহাবিশ্বকে, দূর নাক্ষত্রিক জগতকে দেখে নিতে চায়। এ চোখের সাথে একমাত্র তুলনা মেলে র্যাঁবোর। ত্বকী আর র্যাঁবোর চোখে কি দুরন্ত চাহনি, কী দুরন্ত আহবান ও অনালোকিত-অনালোচিত এবং অচেনা জগতের ভাষা। ত্বকীর চোখে যেনো কল্পনা আগুনের স্ফ‚রণ আবার কখনো সংগ্রামের বিজয় উল্লাসের ঝলক।

ত্বকী সব সময়ই দুষমনের দুর্জয় দুর্গ ভেঙে, কালের করাল প্রহরাকে উত্তরণে সমসাময়িককে পেছনে ফেলে যায় বলেই কালের বৃত্তে বন্দি রক্ষণশীলরা, প্রথাবদ্ধ ও প্রগতির প্রতিরোধকারীরা তাদের সহ্য করতে পারেনি। তাই তাকে হত্যা করে রক্তের হলি-উৎসবে মেতে উঠে। অবশ্যি হত্যার পরও ত্বকীরা কালোত্তীর্ণ হয়ে বেঁচে থাকে মানুষের মনে, প্রাণে ও রক্তকণিকার স্পন্দনে। তাই ত্বকীদের নিমন্ত্রণ- কালে কালে, লোকে লোকে, আলোকে আলোকে।

ত্বকীর এই নির্মম হত্যার সাথে সাথে আমার স্মরণে আসছে ক্ষুধিরাম, প্রফুল্ল চাকী ও সোমেন চন্দকে। আমি বার বার দেখি একই অভিযোজনায় তারা দাঁড়িয়ে সমবেত কণ্ঠে উচ্চারণ করছে-
‘ও আমার দেশের মাটি
তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।’