235

স্নেহের ত্বকী,
তুমি আমাকে চিনবে না…
তোমার মতো আমারও জন্ম এই দেশে, এ ধান-সিঁড়ীটির তীরে
এখন আমি দূর দেশে হারিয়ে যাওয়া দলছুট একজন মানুষ।
শীতের পাখির মতো উষ্মতা খুঁজতে বছরান্তে ফিরে ফিরে আসি।
তখন দু’এক বার তোমার সাথে চকিতে দেখা হয়েছে আমার।
কখনো সূধীজন পাঠাগার, গ্রীনলেজ ব্যাংকের মোড়ে,
বিজয় দিবস কিংবা একুশের প্রভাত ফেরীতে।
আত্নমগ্ন-ধ্যানী-প্রত্যয়ী এক কিশোর ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে
সৌরলোকের শেষ সূর্যান্তের লাল আভাটুকু স্পর্শ করবে বলে।
তোমার সে মুখে আমি দেখেছি অপাপবিদ্দ কিশোর রবীন্দ্রনাথকে।
মরালিষ্ট তলস্তয়, আর দার্শনিক লালনের মানবিক মানষকে।

তোমাকে প্রথম দেখি রবীন্দ্র জয়ন্ত্রী অথবা পহেলা বৈশাখের কোন এক অনুষ্ঠানে
তুমি তখন খুব ছোট, মায়ের কোল জুড়ে বসে থাকা দেবশিশু!
শান্ত-মায়াময়-বুদ্দিদীপ্ত চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তুমি আমাকে দেখলে।
তোমার মাকে বললাম- আপনার এ ছেলে বড় হয়ে খুব জিনিয়াস হবে।
তোমার মা বললেন- দোয়া করবেন যেন বাবা-মা’র মুখ উজ্জল করে।
আমি বললাম- ওর চোখ বলছে শুধু বাবা মা নয় ও আমাদের দেশের মুখ উজ্জল করবো।
তুমি ঠিক তাই করেছিলে।
তোমার মৃত্যুর পরদিন আমরা জানলাম তুমি কেমেষ্ট্রিতে হাইষ্ট নাম্বার পেয়েছিলে।
তোমার মা কিন্তু একসময় খুব ভাল কবিতা পড়তেন!
জীবনানন্দের কবিতা তার কণ্ঠেই আমি প্রথম শুনি

তোমার মায়ের কবিতা শুনে আমরা তাকে আড়ালে ডাকতাম- জীবনানন্দের বনলতা সেন।
এ রকম লাজুক- ভীত হরিণীর মতো একটা মেয়ে কী করে ষ্টেজে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ে সেটা
আমাদের মনে তখন ভারি বিষ্ময় জাগাত।

আর তোমার বাবা! আমার দেখা পৃথিবীর ভালো মানুষদের একজন।
না, কেবল ‘ভালো মানুষ’ বলে তোমার বাবাকে ঠিক সংজ্ঞায়িত করা যায় না।
আমাদের কাছে তোমার বাবা এক আলোর দিশারী।
এরকম মনন-প্রজ্ঞা-নীতি আর আদর্শের মিশেল খুব কম মানুষের মধ্যে থাকে।
সব রকম জুলুম-অন্যায়ের বিরদ্ধে তোমার বাবা সবসময় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
দেশের যে কোন দুর্যোগ-দুঃসময়ে, আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সবার আগে
মিছিলে হেঁটেছেন, শ্লোগান কণ্ঠ মিলিয়েছেন। বুক পেতে দাঁড়িয়েছেন মানুষের পাশে।
চেতনায় তোমার বাবা আমাদের চেগুয়েবারা, প্রজ্ঞায় আমাদের তাজউদ্দীন আহামেদ
সাধনায় সূফী, মননে চিরায়ত বাঙ্গালি।
এরকম একজন সংবেদনশীল মানুষকে কাঁধে নিতে হলো সন্তানের লাশ
এ বেদনা, এ কষ্ট, এ হাহাকার প্রতিদিন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মতো।

তুমি আমাদের ক্ষমা করো ত্বকী।
হায়েনার নখড় থেকে আমরা তোমাকে বাঁচাতে পারিনি
আমাদের নষ্ট রাজনীতি, আমাদের দানবীয়-রাক্ষুসে রাজনীতিবিদরা
কেড়ে নিয়েছে তোমার জীবন।
ওদের লোভ, ওদের লালসার আগুনে আমরা সবাই
আত্মহুতি দিয়ে চলেছি বছরের পর বছর।
নব্য এই ইংরেজদের বিদেশে বাড়ি-গাড়ির অর্থের জোগান দিতে গিয়ে
আমরা ক্রমশ সর্বশ্রান্ত হচ্ছি।
ওদের কুলাঙ্গার সন্তানদের বিদেশে ফুর্তির ডলার জোগাতে
দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে আমাদের ঋণের বোঝা।
এই লুটেরাদের ভয়াল থাবায় ভেঙ্গে পড়ে আমাদের শেয়ার বাজার,
পাচার হয়ে যায় ব্যাংকের টাকা, ভেঙ্গে পড়ে আমাদের স্বপ্ন- আমাদের পদ্মা সেতু
এই চাঁদাবাজদের ক্ষমতার মোহে চুরি হয়ে যায় আমাদের ব্যালট বাক্স, আমাদের গণতন্ত্র।
লুট হয়ে যায় আমার সংখ্যালঘু বোনের সম্ভ্রম, সাজানো সংসার-সিথির সিঁদুর।

তুমি আমাদের অপরাধী করে দিয়ে গেছো ত্বকী
তোমার মৃত্যু আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়
বাংলাদেশ এক সন্ত্রাসের জনপদ
তোমার মৃত্যু আমাদের বলে দেয়
এই রাষ্ট্রযন্ত্র আজ পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেছে সন্ত্রাসীদের
নয়তো তোমার আর্তনাদ, তোমার বাবা-মা আর এ শহরের প্রতিটি মানুষের
কান্নার শব্দ কেন শুনতে পাবে না আমাদের দেশের পার্লামেন্টিয়ানরা?
কেন এ দেশের রাষ্ট্র প্রধান বলবে না-
রাব্বী, ভাই আমায় ক্ষমা করো! তোমার ছেলেকে আমি নিরাপত্তা দিতে পাড়িনি
তোমার সন্তানকে আমি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দিতে পাড়িনি।

আমাদের ক্ষমা করো ত্বকী
তোমার হত্যাকারীদের আমরা বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করাতে পাড়িনি।
কিন্তু আমরা এখনো হাল ছেড়ে দিইনি।
এ পোড়া দেশের ছোট্ট এ শহরটিতে এখনো আমরা
তোমার ছবি টাঙ্গিয়ে রাখি শহীদ মিনারে।
তোমার নাম করে ভালবেসে প্রদীপ ভাসিয়ে দেই শীতলক্ষ্যার জলে
এখনো আমরা অনশন করি, নীরবে কাঁদি তোমার কথা ভেবে।

কান্না মানেই দুর্বলতা নয়
প্রদীপ জ্বালানো মানেই নীরবতা নয়
অনশন মানেই থেমে যাওয়া নয়।
দানব তুমি যতই দানবীয় হও
তোমার নিশ্চিত মৃত্যু গণমানুষের পায়ের তলায়
ত্বকী তোমার হত্যার বিচার না হলে
আমাদের এই কান্না ক্রমশ পরিনত হবে ক্ষোভে,
বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠবে আমাদের জনপদ।
আমাদের একেকটি হাত হয়ে উঠবে উজ্জল মশাল
তারপর জালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবো।
সন্ত্রাসের সব আস্তানা-চোরাগলি
এবং সবশেষে গুঁড়িতে দেব শুয়রের খোয়াড়।

শহিদ হোসেন খোকন