267

শাহবাগের প্রতিবাদ

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী

ঢাকার শাহবাগের আন্দোলন বাংলাদেশের সর্বত্র এমনকি বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে এবং ইন্টারনেট ভিত্তিক সামাজিক মাধ্যমে মানুষের ব্যাপক কৌতুহল ও আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিবাদটি শুরু হয়েছিল ২০১৩ এর ৫ ফেব্রুয়ারী, যেদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার রায় ঘোষণা করে। এ রায়ের প্রতিবাদে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবীতে ও জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধের দাবী করে এ আন্দোলন শুরু হয়। কিছু ইন্টারনেটে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীরা পতাকা হাতে নিয়ে আন্দোলনটি শুরু করেছিলেন। এবং খুব দ্রুতই শাহবাগ এলাকাটি সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি মানব সমুদ্রে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে। প্রতিবাদের এ স্থানটিকে তারা আদর্শিক ও যৌক্তিক জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করে। এ ধরনের প্রতিবাদ দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নামে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও আমরা এ ধরনের প্রতিবাদ লক্ষ্য করি। কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবীতে শাহবাগে যে গণজাগরণ তৈরী হয়েছিল তা দেশের ইতিহাসে অন্যতম একটি মাইলফলক। বছরের পর বছর নিপিড়ন ও অবরুদ্ধ হতাশাই এ আন্দোলনকে তীব্রতর ও গতিশীল করেছে। অর্থাৎ প্রচণ্ড নিপীড়ন ও হতাশাই এ দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে কাদের মোল্লার মত রাজাকাররা প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করেছিল। ধর্ষণ, গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগ সহ বহুবিধ অপরাধের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিচারের রায় দেবার জন্য ট্রাইব্যুনালের তিন বৎসর সময় লেগেছে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ এবং যুদ্ধের সময় তার বর্বর দুষ্কর্ম ও নিষ্ঠুরতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনাল তাকে যাবৎজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। তাই তরুণ সমাজ রায়টি প্রত্যাখ্যান করে শাহবাগে ২৪ ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। শহবাগের জায়গাটির ‘প্রজন্ম চত্বর’ নাম হয়ে ওঠে। যা প্রকৃতপক্ষে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি প্রতিবাদের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা ২৪ ঘন্টা ধরে কিছু স্বেচ্ছাসেবকের সহায়তায় তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। যারা তাদের খাবার ও পানি দিয়ে আন্দোলনকে উজ্জ্বীবিত করেছিল। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবীতে সমগ্র দেশ ও জাতির মধ্য এক ঐক্য গড়ে ওঠে। তারা একটানা গান, কবিতা, আবৃত্তি ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্লোগান তুলেছিল ঘোষিত রায়ের ও যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে। এ আন্দোলনের সাথে কোন রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিলনা। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম দেশ ও জাতির ভবিষ্যত চিন্তায় এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা ধর্ম নিরপেক্ষ এক নতুন বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিল। যেখানে ইসলাম বা কোন ধর্মই রাজনীতিতে ব্যবহৃত হবে না। এবং কোন সংঘবদ্ধ প্রচার কার্যে জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে না। তারা জামায়াতে ইসলামী-কে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধের ও ’৭১ এর যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মৃত্যুদন্ডের দাবী জানিয়েছিল। সাধারণ জনগণ আশাহত হয়েছিল। কেননা তারা শাহ্বাগের আন্দোলনের স্বরূপ ও তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেনি। যদিও এটা একটি মাইলফলক। এখানে সমগ্র জাতি আরো একবার স্বাধীনতার শক্তিতে উজ্জ্বীবিত হয়ে একত্রিত হয়েছিল। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ যেমন স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণেরা এ কর্মসূচিতে, মিছিলে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। এবং এ কর্মসূচিগুলি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছিল। এখন আমাদের কর্তব্য হচ্ছে তারুণ্যের এ বৃহৎ আন্দোলনকে কোনভাবে ব্যর্থ হতে না দেয়া; এবং তা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের দেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঐসব যুদ্ধাপরাধীদেরকে পরাজিত করেছিল এবং এখন আমাদের উচিৎ তাদের বাঁধা দেয়া যাতে তারা দেশের অগ্রগতিতে কোন প্রতিবন্ধকতা গড়ে তুলতে না পারে। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির আজ সশস্ত্রভাবে তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। কিন্তু ৪২ বছর পূর্বে মানুষ তাদের পরাজয় দেখেছিল। ২০১২ সালের শেষ সময় থেকে আমরা তাদের ব্যপকতম সহিংসতা লক্ষ্য করি।

সাম্প্রতিককালে তারা বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়েছে এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি ও বোমাবাজির মাধ্যমে প্রকাশ্যে রাস্তায় জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে চলেছে। গণ-মাধ্যম থেকে জানতে পারি, তারা দেশের মধ্যে একটি বড় ধরনের অরাজকতা তৈরীর উদ্দেশ্যে ‘আত্মঘাতি হামলা’রও পরিকল্পনা করছে। এখন এটা আমাদের কর্তব্য যে, যেকোন মূল্যে এদেরকে প্রতিহত করা। সাম্প্রতিককালে জামায়াত-শিবির যাই তাণ্ডব করুক না কেন আমাদের উচিত জনগণকে আহ্বান করা ও সম্মিলিত কণ্ঠে শ্লোগান তোলা ‘জামায়ত-শিবির নিপাত যাক’।