Short Stories

239

ভদ্রলোক

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী

হঠাৎ শুরু হল ঝমঝম বৃষ্টি। অনেকক্ষণ ধরেই আকাশ মেঘলা করলেও এরকম বৃষ্টি কেউ আশা করেনি। ভ্যাপসা গরম আবহাওয়া থেকে এত সহজে নিস্তার পাওয়া যাবে বলেও কেউ ভাবেনি। বড় বড় বৃষ্টির ফোটা আছড়ে পরছে আকাশ থেকে। আছড়ে পরছে ঘর-বাড়ির ছাদে, মানুষের মাথায়, রাস্তার উপর, রিক্সার উপর। মাতাল এক গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। মন ভোলোনো গন্ধ। তবে আনন্দের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আগেই মেঘ গর্জে উঠে; তার সাথে রাস্তায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে বৃষ্টিতে শরীর ভিজিয়ে নেওয়া রমজান আলীর বুক ও কেঁপে কেঁপে উঠে। ঝড়-বাদলার দিন। ছোট বেলায় এরকম সময়ে কতকিনা খেলা খেলেছে। খেলার মাঝে দু-চার বার ডিগবাজিও খেত রমজান। তখন চারদিকটা ছিল পুরোপুরি ফাঁকা। তখন খেললেও মজা, না খেললেও আনন্দের সীমা ছিল না। মাঠের মধ্যে বসে থাকতেও ভাল লাগতো তার। বাড়ীর স্যাঁতস্যাঁতে মেঝেতে শুয়ে থাকাতেও একটা মজা ছিল। কিন্তু সে সময় তার বিরক্ত লাগত বেরসিক মকবুল স্যারের পড়াটা মুখস্ত করা।

পিছনে গাড়ির হর্ণ শুনে রমজান তার রিক্সাটা একটু সামনে এগিয়ে লাখল। গাড়িটা বের হতে পারছিলনা। আর ড্রাইভারদেরও তর সয় না। রমজান আলীর চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। বৃষ্টির পানি রিক্সার সিট, হুড, চাকার ওপরে টিনগুলো ধুয়ে দিয়েছে। সে হুডটা উঠিয়ে দিল। ধোয়া সাফসুতোর রিক্সা যেন চকচক করছে। এত পরিস্কার রিক্সা চালানোর মজাই আলাদা। সকালে কেরামত রিক্সা পরিস্কার করলেও এমনটা হয় না। ওরতো বেলের বাটিতেই হাত পড়ে না। ফাঁকিবাজ। সব কাজ তার নিজের করা লাগে। আগেতো এত সমস্যা ছিলনা। সে দেখেছে তার বাবা কতদিন হাসি মুখে বাড়ি ফিরেছে। তার নিজের দিনগুলোওতো কত সহজ ছিল। দেশটা দিনে দিনে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। 

হঠাৎ করে বলা নেই, কওয়া নেই এক লোক হুট করে রিক্সায় চেপে বসল। পর্দাটা প্রায় ছোঁ মেরে টেনে নিয়ে বলে উঠল ফার্মগেট। আরে রমজানতো নাও যেতে পারত! নাহ্, লোকটাকে পৌঁছে দেই। বৃষ্টির দিকে তাকালেতো আর পেট চলবে না। গরিবের পরিশ্রমই সম্বল। রমজান স্কুলে পড়েছে, পরিশ্রমে ভাগ্য ফেরে। তখন আর কতকি পড়েছে। ও সব কথা ঠিক মনে পড়েনা। স্যারদের মুখে তখন কত কত কথা শুনেছে। তবে কথাগুলো যে অনেক দামী ছিল, তাতে সন্দেহ নেই রমজানের। কত বড় বড় লোকেরা বইগুলো লিখতো। রমজান ভাবে এই বড় বড় লোকগুলোই আবার কিসব কাণ্ড করে বসে। কাজ করতে হবে,তাহলেই ফল পাওয়া যাবে। বৃষ্টির দিনে ভাড়াও বেশি পাওয়া যাবে। রমজান আলী দ্রুত উঠে তার সিটে বসে প্যাডেল মারতে শুরু করল।

লোকটাকে ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। কোর্ট-টাই পড়েছে, ইস্তিরি করা শার্ট, জুতাটাও একেবারে চকচক করছে। রমজান লোকটার পলিশ করা জুতার দিকে তাকালে তার নিজের পা’টা যেন খালি খালি মনে হয়। পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল আর গোড়ালীর দিকে তার স্পঞ্জের স্যান্ডেল অনেকটা খেয়ে দেবে গ্যাছে। স্যান্ডেলটা পায়ের তালু ছুয়েছে। এটাতো এতদিন ঠিকই ছিল। এখন হঠাৎ কী হলো। পায়ে খুব অস্বস্তি লাগছে। সে জোরে জোরে রিক্সায় প্যাডেল মারতে লাগল। রাস্তার জমে যাওয়া পানিতে তার পা মাঝেমধ্যে লেগে সারা গা শিরশির করে উঠছে। রবারের প্যাডেলটাও এত নরম হয়েছে যেন, চাপ দিলেই দেবে যাচ্ছে। ছোটবেলায় বৃষ্টির দিনে নরম কাদামাটিতে খালি পায়ে হাটার কথা মনে পড়ে রমজান আলীর। আজকেও হাটতে হবে। চকচকে জুতো পরে রিক্সায় বসা ভদ্রলোকটিকেও আজ হাটতে হবে।

‘হরলিকস্ শেষ? বিস্কুটও নেই? এই বৃষ্টির মধ্যে কোথাও নামা যাবে না। বারান্দায় এসে দেখ কত বৃষ্টি-’ কার সাথে কথা বলছে লোকটা ?

রমজান আলীর একটা গরু ছিল। ওর দুধের পায়েসটা ছিল রমজানের খুব প্রিয়। রমজান ধান কাটার সময়ে তার বাবার সাথে সাথে থাকতো। গেল বড় বন্যায় তার বাবা মরেছে। আর তখন থেকেই এই রিক্সাটা তার সঙ্গী। প্রায়ই গায়ে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনা।

‘এই রাখ, রাখ’। একটা লাইট পোষ্টের পাশে রিক্সাটা রাখল রমজান আলী। লোকটা সিটেই বসে রইল। তার গায়ে যাতে বৃষ্টির ছিটা না লাগে তাই পর্দাটা ঠিকমতো ধরে রাখতে সে ব্যস্ত। আবার ডান হাত দিয়ে সে মানিব্যাগটা বের করার চেষ্টা করছে। অবশেষে ২০ টাকার একটা নোট বের করতে লোকটার বেশ পরিশ্রমই হল। ভাড়া এমনিতেই ২৫ টাকা। বৃষ্টির জন্য   অন্তত ১০ টাকা বেশি হওয়ার কথা।

২০ টাকা কেন?

বিদঘুটে মুখ করে তাকালো ভদ্রলোক। নাহ্, ভদ্রলোকদের রমজান এখনো ঠিক চিনে উঠতে পারেনি। অন্যদের মত খেচ্খেচ্ করতে রমজানের ভালো লাগেনা। যাক ভালোয় ভালোয় লোকটা নেমে পড়লেই বাঁচি।

রিক্সা থেকে নেমেই লোকটা একটা ধূসর দালান লক্ষ্য করে দৌড়াতে লাগল। বৃষ্টির মত কত কিছু থেকেই না বাঁচতে ভদ্রলোককে এমনি দৌড়াতে হয়। রমজান তাকিয়ে তাকিয়ে তার দৌড় দেখল। তার সুট-কোর্ট, চকচকে জুতো, মাথা, গোটা ভদ্রলোকই ভিজে চুপ চুপ হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তে লাগলো। রিক্সার হুডটা ফেলে দিল রমজান আলী। তীব্র গতিতে ছুটতে লাগল সে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেলেও জমার টাকাওতো এখনো জোগাড় হয়নি তার। মুষলধারে বৃষ্টিতে ছুটতে লাগল রমজান অন্য কোন ভদ্রলোকের খোঁজে।