168

বন্দি

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী

বাড়ী ফিরতে আজোবুঝি দেরি হয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে পাড়ার মোবাইল ফোনের দোকানটার কাছে দাঁড়ায় রতন। উকি দিয়ে সময়টা জেনে নেয়। মাত্র আড়াইটা বাজে। চারটা বাজতেতো ঢের বাকী। আরো কিছুক্ষণ বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া যেত। যাক্ তা যখন হলোই না, দোকানটায় বসে কিছুক্ষণ টিভি দেখা যাক। আর যাই হোক সোয়া চারটার আগে বাসায় যাওয়া চলবেনা। গেল সপ্তায় স্কুল পালিয়ে আলিফ ভাইয়ের বাসায় খিচুড়ি খেয়েছে রতন। খিচুড়িটা দারুন হয়েছিল। কিন্তু দোকানেতো এখন চা না খেলে শুধু শুধু বসে ওরা টিভি দেখতে দেবেনা। এতক্ষনতো আবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকায়ও যায়না। গরমে রতনের সারা গা জ্বলে জাচ্ছে। হঠাৎ দরজা ঠেলে দোকান থেকে মোটা কালো একটা লোক বেরিয়ে এলো। রতনের দিকে তাকিয়ে রাস্তায় পানের পিক ফেলে আবার দোকানে ঢুকে পড়লো। লোকটার চেহারার যা ছিরি যেন রতনকে গিলে খাবে। কষে একটা চড় মারতে ইচ্ছে করে রতনের। দোকানে ঢুকলেই বলবে কি চাই ? তারপর বলবে, বাড়ি গিয়ে ঠান্ডা হাওয়া খাওগে, এখানে না। রতন হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে পোড়া বাড়ীতে ঢুকে পড়ে। কবে যে এ বাড়িটি পুড়েছে, জনশূন্য ও পরিত্যক্ত হয়েছে তা রতনের জানা নেই। কিন্তু ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। মাঝেমধ্যে রতনের অন্য বন্ধুরাও এখানে আসে, সিগারেট খায়। রতনও খায়। হঠাৎ প্রচন্ড ঘুম পায় রতনের। চোখের পাতা যেন ভারি হয়ে আসে। -রতন, এখানে কি করিস? এই রতন, রতন, এই রতন স্কুলে গেলি না যে? -অসুখ ছিলো। -কি অসুখ? -জ্বর! -জ্বর নিয়ে তুই বৃষ্টিতে ভিজছিস? কই, তোর কপালতো ঠান্ডা। আজকেও স্কুল পালিয়েছিস? আসিফের উপর ভীষণ রাগ হয় রতনের। -তোর এতো মাথা ব্যাথ্যা কেন? যাতো এখান থেকে, ফাজিল কোথাকার। এই আসিফটা সবখানে ঝামেলা বাঁধায়। ওর প্রশ্নের অভাব নেই। আবার তর্কেও পাকা। স্যারদের সাথেও তর্ক করে। গত সপ্তাহে রহমান স্যার ওকে গুনে গুনে ১০০ বার উঠ-বস করালো। তারপরও শিক্ষা হয় না। ওকে ১০০০ বার উঠ-বস করানো দরকার। কখন বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে টের পায়নি রতন। -স্কুল ছুটি হয়ে গেছে? প্রশ্ন করে রতন। -ছুটির পরেতো হেড স্যারের কোচিংও শেষ করে এলাম। -স্যার আমার কথা জিজ্ঞেস করলো? -নাহ্। ক্লাশে আমাদের গুনে গুনে ৪৩জন ছাত্র। দু’চারজন না গেলেও বুঝতে পারেনা। তা তুই আর মজিদ খালি ক্লাশ ফাঁকি দেস্ কেন? -বললাম না, জ্বর। -তোর কপালতো ঠান্ডা। আবার স্কুলের ব্যাগ নিয়েইতো বেরিয়েছিস দেখছি। -জালাসনেতো আসিফ। বাসায় যা। -তুই যাবিনা? বৃষ্টির ঝাজ কমে এলেও টিপ টিপ করে পড়ছে। এখন নিশ্চয়ই পাঁচটা, সাড়েপাঁচটা বাজে। নিজের ভিতরেই জীবন্ত এক ঘড়ি আছে ভেবে রতনের খুব ভালো লাগে। কাঁধে ব্যাগটা নিয়ে হাঁটা শুরু করলো সে। জোরে জোরে হাঁটতে থাকে। আসিফের কোন কথাই এখন সে শুনতে পায় না। বাড়ি ফিরতে দেরী হয়ে গেল। না জানি আজ কি আছে কপালে। বাড়ির গেটে পা রাখতেই মায়ের কন্ঠস্বর- -কই রতন আসছে? এই দিকে আয়। দেখ তোর খালা আসছে। ঘরে ঢুকেই দেখে খালুর সাথে গল্পে মেতে আছে তার বাবা আর ভাইয়া। তিন বছরের খালাতো বোন রাতুল খাটের নীচ থেকে বেরিয়ে এসে তুলিকে জাপটে ধরলো। -আমি এখন লুকাবো, আমি লুকাবো তুলি আপু। আবার মায়ের ডাক শুনে রতন তরিঘড়ি করে মায়ের ঘরে যায়। -আমার রতনের কত পড়া। বুঝলি সুমি, ক্লাশ এইটের পরীক্ষা দিব। গতবারতো এতো পড়ার পড়েও পাশ করতে পারলো না। পোলাপানরে এতো পড়া কেমনে দেয়? ছোট জানটায় এত কিছু শয়? খালার উত্তর পূর্ব নির্ধারিত, -আর বলোনা আপা, সবখানেই এক অবস্থা। আমার পাশের বাসার ভাবীর মেয়ে রত্না, দেখলে আসলেই মায়া লাগে। মেয়েটা এতগুলো কোচিং-প্রাইভেট করেও দুইবার টেনে পড়লো। এইযে ফেব্রুয়ারি না মার্চে আবার পরীক্ষা দেবে। গোটা সমাজের সাথে নিজের এত বড় সংযোগের কথাটা জানতে পেরে রতন মায়ের পাশে বসে পড়লো। মা রতনের ডান হাতটা ধরে কাছে বসায়। ঠিকইতো শাহীন, মজিদ, ফাহিম, আদর কত জনইতো ফেল করলো। বিশ্বে কত কত মানুষইতো ফেল করে। সবাইতো আর বিদ্যাসাগর হবেনা। মা রতনের হাতটা ধরে খালার সাথে গল্পে ডুবে যায়। নানির অসুস্থতা, ছোটো মামার চাকুরী, এক নানার হজ্বে যাওয়া, বড় মামার ছেলে হওয়া, মেজো খালুর ………..। বসে বসে রতনের পা যেন অবশ হয়ে আসে। মায়ের হাত থেকে রতন হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে। তার অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ভেতরটা ছট্ফট্ করে। রতনের এখন ওঠা নিষেধ। ঘরের বাইরে যাওয়ায় নিষেধ। স্কুলটা রতনের একদম ভালো লাগেনা। অবশ্য স্কুলটা থাকাতেই সে এতটা স্বাধীন। স্কুলের নাম করে কতখানেই না যাওয়া যায়, কত কি না করা যায়। মাঝেমধ্যে বড়দের সাথে মিছিলেও যায়। সিগারেট ফুঁকে। কিন্তু রতনের হাত এখন তার মায়ের হাতের মুঠোয় বন্দি। তার উঠে যাওয়ার সব চেষ্টাই ব্যর্থ। ও হ্যাঁ , মা আর খালা এখন পিয়াজ আর আলুর দাম বৃদ্ধি নিয়ে শুরু করলো। তারা ভিষণ ক্ষুব্ধ, মর্মাহত।